সর্বশেষখেলা

মাহমুদউল্লাহর সেঞ্চুরি যোদ্ধার মত

ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের ২০২৩ বিশ্বকাপ শুরু হয়েছিল স্বপ্নের মতো। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৯২ বল হাতে ৬ উইকেটে জয়।মাহমুদউল্লাহর সেঞ্চুরি যোদ্ধার মত

মাহমুদউল্লাহর
মাহমুদউল্লাহর

বোলিং, ব্যাটিং- দুই বিভাগেই নিজেদের আধিপত্য দেখিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে এমন কিছু করার বার্তা দিয়েছে যা আগে কখনো পাওয়া যায়নি। কিন্তু সেই বাংলাদেশ এখন ধ্বংসপ্রাপ্ত বিদ্যালয়। পরের চার ম্যাচে বাজে জয় দিয়ে শুরু হওয়া অসহায় আত্মসমর্পণ বাংলাদেশ দলের শক্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। দেশের ক্রিকেটারদের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দলের সমস্ত ব্যর্থতার মধ্যে, কেবল দু’জন উজ্জ্বল ব্যতিক্রম ছিলেন – মুশফিকুর রহিম এবং মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের দুই ভাই। এই দুজনের মধ্যে আবারো জ্বলে উঠলেন মাহমুদউল্লাহ, যাকে বিশ্বকাপ দলে জায়গা পাওয়ার প্রশ্নে শঙ্কর সাগরকে পথ দিতে হবে। পরীক্ষিত মিউজিশিয়ান হয়েও দলে জায়গা পেতে ‘পরীক্ষা’ দিতে হয়! বিশ্বকাপ চলাকালে ‘বিশ্রাম’-এর নামে তৎক্ষণাৎ দল থেকে ছিটকে পড়েন মাহমুদউল্লাহ।যেহেতু মার্চে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের পর তাকে ‘বিশ্রাম’ দেওয়া হয়েছিল, সেই বিশ্রামের শীটে ধরা পড়া মাহমুদউল্লাহ আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে সিরিজ, আফগানিস্তানের বিপক্ষে হোম সিরিজ এবং এশিয়া কাপ খেলতে পারেন।

এমনকি মাহমুদউল্লাহকে দলে ফেরানোর দাবিতে বিক্ষোভও করেছে দেশটির ক্রিকেট ভক্তরা। কিন্তু সেই দাবি বিসিসিআই নেতা ও ভোটারদের অনেক ভাবনার জবাব দিতে পারেনি। দলের সিনিয়রদের দ্বারা উত্থাপিত স্লোগান এবং সিনিয়র এবং ‘বৃদ্ধদের’ ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য বিসিসিআই যে পরিকল্পনা নিয়েছিল, মাহমুদউল্লাহর দীর্ঘ ‘সাবেটিকাল’ সেই পরিকল্পনার একটি অংশ ছিল, বোর্ড নেতাদের কথায় স্পষ্ট হয়ে গেল।

মাহমুদউল্লাহর
মাহমুদউল্লাহর

বিসিসিআইয়ের অন্যতম সক্রিয় পরিচালক খালেদ মাহমুদ সরাসরি বলছেন, মাহমুদউল্লাহ কেন অবসর নিচ্ছেন না তা তিনি বুঝতে পারছেন না। ফলে পরিস্থিতি এতটাই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে যে, অভিজ্ঞ মাহমুদউল্লাহর বিশ্বকাপ দলে থাকবেন কি না, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় দেখা দিয়েছে। বিশ্বকাপের আগে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হোম সিরিজে বিসিসিআই বিচারকদের ‘প্রথম গ্লাস টেস্ট’ দিয়ে সন্দেহের নদী পার করেছেন মাহমুদউল্লাহ। শুধু ব্যাট হাতে দৃঢ় ব্যাটিংই নয়, বিশ্বকাপ দল থেকে তামিম ইকবালের বিদায় নেওয়ার ঘটনাও হয়তো ভূমিকা রেখেছে মোহাম্মদ আল্লাকে দলে ডাক পাওয়ায়।

তার পেছনের কারণ যাই হোক না কেন, মাহমুদউল্লাহ তার যোগ্যতা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিশ্বকাপ দলে জায়গা করে নিয়েছেন। একই মাহমুদউল্লাহ লিখে চলেছেন বিশ্বকাপে দলের চূড়ান্ত ব্যর্থতার গল্প, মাথা উঁচু করে লড়াই করা এক যোদ্ধার গল্প। বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত দলের বাকিদের পারফরম্যান্স মাহমুদউল্লাহর ব্যাটিং গল্পের মতো। আফগানিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে একাদশে থাকলেও ব্যাট হাতে মাঠে নামার সুযোগ পাননি তিনি।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পরের ম্যাচে প্লেয়িং ইলেভেন থেকে বাদ পড়েন তিনি। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পরের ম্যাচে একাদশ পরিবর্তন করা হয়; কিন্তু টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানদের ব্যাটিং ব্যর্থতার পর অভিজ্ঞ মাহমুদউল্লাহকে লোয়ার অর্ডারে ব্যাট করতে পাঠানো হয় ৮ নম্বরে। কিন্তু সেই পরিস্থিতিতে উৎসের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে ৪১ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন তিনি।

মাহমুদ আল্লার মতো একজন অভিজ্ঞ ও পরীক্ষিত ব্যক্তিকে কেন ৮ নম্বরে খেলতে হয় তা দেখে বিদেশি ক্রিকেট মন বিস্মিত। প্রশ্ন উত্থাপন কর. কিন্তু বিদেশি ক্রিকেট বুদ্ধিজীবীদের সেই সমালোচনা বাংলাদেশ টিম ম্যানেজমেন্টকে ব্যবস্থা নিতে পারেনি। ভারতের বিপক্ষে পরের ম্যাচে দলের ব্যাটিং ব্যর্থতার কারণে তার নাম রয়েছে ৭ নম্বরে। কিন্তু একজন যোদ্ধার কাজ হলো যুদ্ধ করা এবং যেখানে যুদ্ধ করার সুযোগ আছে সেখানে বিজয়ী হওয়া। ভারতের বিপক্ষে ৪৬ রানের ৭ ইনিংস খেলে জিতেছেন মাহমুদউল্লাহ। আর পরদিন মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে কল্পনাকেও ছাড়িয়ে গেলেন মাহমুদউল্লাহ।

মাহমুদউল্লাহর

৩৮৩ রানের অসম্ভব লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ৪২ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে বাংলাদেশ দল। এ অবস্থায় এক ধাপ পদোন্নতি পেয়ে ৬ নম্বরে ব্যাট করতে নামলেন মাহমুদউল্লাহর। কিন্তু উইকেটে থিতু হওয়ার আগেই আউট হয়ে যান মুশফিকুর রহিম, মেহেদি হাসন মিরাজ। ৮২ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে নদীর ধারে পৌঁছে যায় দলটি। বাকি ৪ উইকেট থেকে দল আর কত সংগ্রহ করতে পারবে? আসলে, ১০০ এর আগে আউট হওয়ার ভয় প্রবল ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের ঠান্ডা বাতাসে দাঁড়িয়ে মাহমুদউল্লাহর ভাবছিলেন অন্য কথা।

দীর্ঘ ১৬ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে দলকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে বহুবার বাঁচিয়েছেন তিনি, আর একবার কেন নয়? মাহমুদউল্লাহর পরিকল্পনা অবিশ্বাস্যভাবে সফল হয়েছিল। লোয়ার অর্ডার ব্যাটসম্যানদের মোকাবেলা করে এবং ১০০’র আগেই বোল্ড আউট হওয়ার ভয়ে বাংলাদেশ ২৩৩ রানের লিড নেয়। নিজে সেঞ্চুরি করেছি। খেলেছেন ১১১ রানের ইনিংস।

এভাবে সপ্তম উইকেটে নাসুম আহমেদের সঙ্গে ৪১ রান, হাসান মাহমুদের সঙ্গে অষ্টম উইকেটে ৩৭ রান এবং মুত্তাফিজের সঙ্গে নবম উইকেটে ৬৮ রানের জুটি গড়েন মাহমুদউল্লাহর। শেষ সেঞ্চুরি করে মাহমুদউল্লাহ দলকে জেতাতে না পারলেও দলের পরাজয় কিছুটা কমাতে পারেন। কিন্তু বিরোধীরা যেভাবে দাঁড়িয়ে লড়াই করেছে, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য। তাছাড়া বাংলাদেশের হয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরির রেকর্ড মাহমুদুল্লাহর দখলে।

এর মাধ্যমে বিশ্বকাপে তিনটি সেঞ্চুরি করেন তিনি। বিশ্বকাপে সাকিব আল হাসানের দুটি সেঞ্চুরি। একটি করেছেন মুশফিক। এর মানে হল বিশ্বকাপের মঞ্চে বাংলাদেশি খেলোয়াড়রা মাত্র ছয়টি সেঞ্চুরি করেছেন, যার তিনটির মালিক মাহমুদউল্লাহ, যিনি টিম ম্যানেজমেন্টের পরিকল্পনা বাতিলের জন্য দায়ী ছিলেন। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে বিশ্বকাপে সেঞ্চুরি করার রেকর্ডও তার। এমনকি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের ইনিংসের মালিকও তিনি। ২০১৫ বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১২৮ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন।

আরও পড়ুন

ইংল্যান্ডকে হারিয়েছে শ্রীলঙ্কা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button